সহস্র এক আরব্য রজনীর ৫৫৪তম রাত
শাহরাজাদ বলতে শুরু করে:
কোনও এক সময়ে বাগদাদে খলিফা নামে এক জেলে বাস করতো। এমনই তার দীন-হীন অবস্থা যে, সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও শুধুমাত্র নিজের উদরান্নের সংস্থান করতে পারতো না। এই কারণে সে ভয়ে শাদী নিকা কিছুই করার দুঃসাহস করেনি। একজনেরই রুটি জোগাড় হয় না, সেখানে বিবি বাল-বাচ্চাদের মুখে সে খাবার দেবে কোথা থেকে! তার মতো দুঃস্থ অসহায় অবস্থা তার পড়শীদের কারুরই ছিলো না।
ফিদিন সাত-সকালে সকলের আগে জাল কাঁধে করে সে নদীতে যায়। সকলের চেয়ে বেশিবার জাল ফেলে। কিন্তু এমনই বরাত, সকলের চেয়ে কম মাছ সে তুলতে পারে।
এই রকম একদিন, নদীতে দশ দশবার জাল ফেলেও একটা চুনো-পুঁটি তুলতে পারলো না। রাগে দুঃখে হতাশায় নদীর উপকূলে বসে পড়ে মাথার চুল ছিড়তে থাকলো সে।
হায় আল্লাহ, একবার অভাগার দিকে মুখ তুলে তাকাও। তুমি ছাড়া যে এ-জগতে আর কোনও ভরসাই নাই আমার। তুমি তো তোমার সৃষ্ট সব প্রাণীকে আহার যোগাও। তবে আমার ওপর এতো নির্দয় হবে কেন?
এইভাবে অনেকক্ষণ হা হুতাশ করার পর আবার সে বুকে ভরসা নিয়ে জাল ফেললো। একটুক্ষণ পরে জাল গোটাতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলো। দারুণ ভার বোধ হচ্ছিল। ভাবলো, এতোদিনে আল্লাহ বোধহয় মুখ তুলে তাকিয়েছেন! বেশ তাগদ খাটিয়েই জালখানা ওপরে তুলতে পারলো সে।
খলিফা অবাক হয়ে দেখলো, না কোনও মাছ নয়, একটা কানা খোঁড়া বাঁদর উঠে এসেছে। মাত্র।
এই সময় রাত্রি শেষ হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।
পাঁচশো পঞ্চান্নতম রজনীতে আবার সে বলতে থাকে?
খলিফা কপাল চাপড়াতে থাকে, এই কী তোমার বিচার হলো মালিক! মাছের বদলে একটা কানা-খোড়া বাঁদর বরাদ্দ করে পাঠালে আমার জন্য?
একখানা রশি দিয়ে বাঁদরটাকে একটা গাছের গুঁড়িতে বেঁধে বেধড়ক প্রহার করতে লাগলো সে। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে সে বলে ওঠে, আমাকে মেরো না জেলের পো, আমাকে এমন করে মেরো না। তুমি আমার কথা শোনো, আর একবার জাল ফেলো। দেখবে, আল্লাহ তোমার আজকের রুটির ব্যবস্থা করে দেবেন।
এক চক্ষু খঞ্জ সেই বাঁদরের কথায় জেলে আবার জাল ফেলে জলে।
এবারে জালটা আরও বেশি ভারি বোধ হয়। অনেক কষ্টে সেবারও জালখানা ওপরে তোলে সে। আর কী আশ্চর্য, এবারও আর একটা বাঁদর। কিন্তু এ বাঁদরটা খোঁড়াও না, কানাও না। দেখতে খুবই সুন্দর। কাজল কালো টানাটানা চোখ, সুন্দর থ্যাবড়া নাক, দাঁতগুলো ঝকঝকে, সাদা মুক্তোর মতো। ওর গায়ে ছিলো লাল সাদা ডুরি কাটা একটা কুর্তা। হাতে ছিলো সোনার বালা। কানে ছিলো দুল। এবং পায়ে ছিলো সোনার ঘুঙুর। বেশ সুন্দর করে। হাসছিলো সে। এবং আড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো জেলেকে।
খলিফা দাঁতে দাঁত চেপে স্বগতভাবে বলে, আজ দেখছি বাঁদরেরই দিন।
আল্লাহ কী পানির সব মাছকেই এই রকম সব বাঁদর বানিয়ে রেখেছেন?
এ বাঁদরটাকেও সে আগের মতো রশি দিয়ে গাছের গুড়িতে বেঁধে প্রথম বাঁদরটাকে তেড়ে বললো, ওরে শয়তান, তোর কথাতেই আমি আবার জাল ফেললাম। তা মাছের বদলে আর
একটা বাঁদর? এবার তোকে মারতে মারতে মেরেই ফেলবো।
প্রথম বাঁদরটা বলে, আচ্ছা আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না। তুমি ঐ বাঁদরটার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখ না, ও কী বলে? আমার মনে হয়, আমাকে পেটালে তোমার পেট ভরবে না, কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বললে আখেরে তোমার ভালোই হবে।
প্রথমটাকে ছেড়ে দিয়ে সে দ্বিতীয়টার কাছে এসে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় বাঁদরটা সহাস্যে স্বাগত জানায় জেলেকে।
খলিফা ওকে ধমক দেয়, এতো হি হি করে হাসার কী আছে? থামো। বলো, কী বলতে চাও?
দ্বিতীয় বাঁদর বলে, আমাকে তুমি চেন, খলিফা?
-না, জানি না। কিন্তু আমার কথার যদি জবাব না দাও, এই চাবুক তোমাকে সব জানিয়ে দেবে।
বাঁদর বলে, আহা অত গোসা করছো কেন? অমন কড়া কড়া কথা বলে কী ফয়দা? তার চেয়ে এসো আমার কাছে। আমার কথা মন দিয়ে শোনো, অনেক লাভবান হতে পারবে।
খলিফা চাবুকটা ফেলে দিয়ে বলে, বেশ বলল। আমি তোমার সব কথাই শুনতে চাই।
বাঁদরটা বলে, এর আগে আমি এক ইহুদীর কাছে ছিলাম। এখনও সে-ই আমার মনিব। লোকটা সুদে টাকা খাটায়। তার কাছে থাকার সময়ে তার ব্যবসার খুব বাড়-বাড়ন্ত হয়েছিলো। প্রতিদিন সে আমার মুখ দেখে দোকান খুলতো। এবং আমার মুখ দেখেই আবার দোকান বন্ধ করতো। লোকে বলে, বাঁদরের মুখ দেখলে নাকি অযাত্রা অশুভ হয়। কিন্তু আমার মনিবের তো ব্যবসা-বাণিজ্য খুব ভালোভাবেই চলছে। যাই হোক, তোমার নসীবটা একবার পরীক্ষা করে দেখ, আমাকে দিয়ে তোমার বরাত কিছু খোলে কিনা।
এক কাজ করো, বাঁদরটা বলতে থাকে। আমাকে জালে জড়িয়ে তুমি আর একবার জাল ফেল জলে। দেখ কী ওঠে।
জেলে বললো, বেশ তাই করছি। ভোর হয়ে আসছে দেখে শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।
পাঁচশো ছাপান্নতম রজনীতে আবার সে বলতে থাকে? ‘
বাঁদরটা যেভাবে বলল, খলিফা সেইভাবে জাল ফেলে।
এবার তার ভাগ্যে একটা বিরাট মাছ ওঠে। তার গায়ের রং রূপোলী। চোখ দুটো ঠিক। যেন দুটো সোনার মোহর।
বাঁদরটা বলে, দেখলে তো আমি কেমন পয়া? যাই হোক, একটা বড়সড় ঝুড়ি নিয়ে এসো। নিচে কিছু পাতা বিছিয়ে মাছটা ভরে নিয়ে বাগদাদ শহরে যাও। আমার কথা যদি বিশ্বাস না করো তবে যাওয়ার আগে আমাদের দু’জনকে বেঁধে রেখে যাও এই গাছের গুড়িতে। পথে যেতে যেতে যদি কোনও লোক জিজ্ঞেস করে কী মাছ পেয়েছ আজ, কোনও জবাব দেবে না।
সোজা চলে যাবে স্যাকরা বাজারে। সেখানে জহুরী সাদার দোকান আছে। লোকটা ইহুদী–সুদখোর। স্যাকরা বণিকসভার শাহবানদার সে। তাকে বলবে, আপনার নাম করে জাল ফেলেছিলাম। আল্লাহ আমাকে এই মাছটা দিয়েছেন। তুমি যখন ঝুড়ি থেকে বের করে মাছটা তাকে দেখাবে, সে জিজ্ঞেস করবে আমাকে ছাড়া আর কাউকে দেখিয়েছ এ মাছ? তুমি বলবে, খোদা কসম, কাউকেই দেখাইনি। তখন সে দাম হিসাবে তোমাকে একটা দিনার দিতে যাবে। তাও নেবে না। এইভাবে সে দাম বাড়াতে বাড়াতে যদি বলে, মাছটাকে সোনা দিয়ে ওজন করে দিচ্ছি তাও নেবে না তুমি। তখন সে জিজ্ঞেস করবে তাহলে কী নেবে?’ তখন তুমি বলবে, পয়সা-কড়ি কিছুই চাই না, মালিক। কয়েকটা কথার বিনিময়ে আপনাকে দিতে পারি এই মাছটা। সে বলবে, কী কথা? তখন তুমি বলবে আপনি উঠে দাঁড়িয়ে বলুন, আপনারা সবাই সাক্ষী, আমি আমার বাঁদরটা এই জেলে খলিফার বাঁদরের সঙ্গে বদল করে নিলাম।
ব্যস, এই তোমার মাছের উপযুক্ত দাম হবে। এরপর আমি তোমার সম্পত্তি হয়ে যাবো। এবং আমার কপালেই তোমার কপাল ফিরে যাবে। প্রতিদিন তুমি জাল ফেলে যা মাছ পাবে, বিক্রি করে একশো দিনার সংগ্রহ করতে পারবে। এবং দেখবে, দিনে দিনে তুমি ধনী হবে এবং ঐ ইহুদী গরীব হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে এমন একদিন আসবে, তখন তুমি হবে বাজারের সেরা বণিক, আর সে কপর্দকহীন হয়ে পথে পথে ভিক্ষে করে বেড়াবে।
বাঁদরটা বললো, যা বললাম, ভালো করে খেয়াল রেখ, তাহলে তোমার সৌভাগ্য কেউ নিতে পারবে না।
জেলে বললো, ঠিক আছে, তোমার কথামতোই কাজ করবো। কিন্তু এখন এই কানা-খোঁড়া বাঁদরটাকে কী করবো? ছেড়ে দেব?
দ্বিতীয় বাঁদর বলে ঠিক আছে, আমাদের দুজনকেই তুমি ছেড়ে দিয়ে যাও। আমরা এই জলেই থাকবো।
খলিফা ওদের দুজনকে খুলে দিতেই ওরা জলে লাফিয়ে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
মাছটাকে ভালো করে ধুয়ে ঝুড়িতে ভরে মাথায় তুলে বাজারের পথে গান গাইতে গাইতে চলে সে।
পথে অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়। সবাই চেনা জানা। তারা সকলেই জানে, লোকটা একেবারে অপয়া। সারাদিনে একটা ভালো মাছ ধরতে পারে না। কেউ কেউ রসিকতা করে জিজ্ঞেস করে, কী গো, জেলের পো, আজ দেখি প্রাণে বসন্ত জেগেছে! তা রুই-টুই কিছু তুলেছ বলে মনে হচ্ছে?
কিন্তু খলিফা কোনও জবাব দেয় না। গান গাইতে গাইতে সে সোজা A চলে আসে ইহুদী জহুরীর দোকানে।
জহুরী বসেছিলো নফর চাকর পরিবৃত হয়ে বাদশাহী কেতায়। পরনে তার মহামূল্যবান সাজ-পোশাক। যে আসনটায় বসেছিলো তা দেখতে প্রায় তখত-এর মতো—অত্যন্ত দামী, বাহারী। দেখে মনে হয় যেন কোথাকার নবাব বাদশাহ।
ভোর হয়ে আসছে দেখে গল্প থামিয়ে শাহরাজাদ চুপ করে বসে থাকে।
পাঁচশো সাতান্নতম রজনী পড়তে বাংলাবক্সের সাথেই থাকুন।

